Skip to main content

ঝুমা চট্টোপাধ্যায়

নিষ্ঠুরতা  বিষয়্ক গল্প


কিছু কিছু প্রেম

............................................................।
নিষ্ঠুরতার গল্পে প্রেম থাকবেই। প্রেমই ভিলেন। ( যেমন , প্রেম ! প্রেম নাম হ্যয় মেরা ! প্রেম চোপড়া !)
লাফাঙ্গা টাইপ দোকানদার ছেলেটা ঠিক অমনি করেই জয়ন্তকে বলল , যেশাস ? যেশাস ফেসাস অবতক নহী আয়া হ্য ইধর !
... কদিন আগে যে অর্ডারটা দিয়ে গেলাম , একটা কালার প্রিন্ট আউট !’’ পালটা কথাটা বলতে গিয়ে  বাকিটা গিলে ফেলল জয়ন্ত । নিকুচি করেছে ... চুলোয় যাক অর্ডার ! তিলে খচ্চর এ ছেলেকে কে এখন বোঝাবে ওরে বাবা তিন দিন আগে যীশু খৃষ্টের একটা কালার প্রিন্ট আউট নিয়ে যাব বলে গেছিলাম । মাপ এ ফোর সাইজ হলেই বেটার ... তখন তো বলা হয়েছিল  হ্যাঁ হ্যাঁ ছবির প্রিন্ট আউট তো ? যখন খুশী এসে নিয়ে যাবেন ! পঁয়ত্রিশ টাকা লাগবে ।
বড়দিন বলে ঘরে ছেলে বায়না ধরেছে , যেশাসের ছবি এনে দাও বাবা ! আমি সাজাবো ... ‘ । কিন্তু শুধু ছবি হলেই তো কাজ শেষ হয় না , অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিষপত্র গুলো কে আনবে ? ভাল কেক , মোমবাতি ,ফ্রায়েড রাইস , মটন কষা ...... সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর প্রিপারেশন ছেলের মা-র ডিপার্টমেন্টে  চলে গেল । জয়ন্ত শুধু ছবি এনেই খালাস ! সানন্দে ছেলেকে জানিয়ে দিয়েছিল , ঠিক সময়ে পেয়ে যাবি ছবি ! তো তাই করেছে জয়ন্ত । বড়দিন আসতে আর মাত্র ঘন্টা সাত কি আটেক বাকি , দুনিয়ার কাজকম্ম আধা চুকিয়ে এই রাত দুপুরে ছবি নিতে এসে দ্যাখে দোকানের কাউন্টারে বিলকুল অন্য একজন বসে । সেদিনের পরিচিত এক কথায় ঘাড় নেড়ে সায় দেওয়া ছেলেটির ধারেকাছে কোথ্থাও কোনো চিহ্ন নেই । এবার কি হবে ? ওই ডিপার্টমেন্টের অফিসার ইন চার্জ এ ডিপার্টমেন্টকে এক কথায় ছেড়ে দেবে ? আদর করে বলবে  , ছবি ? ছবি আনতে ভুলে গেছ তো কি হবে সোনা ? বাবাইএর জন্য যেশাসের ছবি এক্ষুনি রেডী করে দিচ্ছি ! ‘
উঃ ! কি অসম্ভব ক্রূর হাসি তখন অরুনিমার মুখে চোখে ... পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নিষ্ঠুরতার জলন্ত উদারণ সেটা । ভাবলেও গা শিউরে ওঠে । অনুভুতির অন্য নাম নাকি ভগবান ! কাউন্টারে বসা বেয়াড়া গোছের ছেলেটাকে দেখে মনে মনে ভাবল জয়ন্ত , হে ভগবান ! ভগবান এত নিষ্ঠুর কেন ?
নিষ্ঠুর তো ছিল সেই লোকটা । নাজারেথের  রাজা । যীশু ও তাঁর দুই সঙ্গীকে নিজের নিজের কাঁধে ক্রশ  নিয়ে বধ্যভুমিতে যেতে বাধ্য করেছিল । মাথায় কাঁটার মুকুট , রক্তাক্ত পা । অনাহারক্লিষ্ট । তীক্ষ্ন সূর্যালোক ও নরমাংশলোভী কিছু শকুন উড়ছে মাথার ওপর । পশ্চাতভূমিতে কাতারে কাতারে দরশক , চল্ চল্ ! পা চালিয়ে জলদি চল সব ! এমন দৃশ্য আবার কবে  চাক্ষুস করা যাবে কে জানে ! কাণা ছেলেকে চক্ষুষ্মান করে ফেলা , খোঁড়াকে দৌড়তে শেখানো , ... শিশুরা নাকি ভগবান ! সরে যাও তোমরা । শিশুদের আমার কাছে আসতে দাও ... ‘’ । আরও আছে তারপর , ‘’ তোমার প্রতিবেশী তোমার ভাই । আমরা সকলে ঈশ্বরের পুত্র , তিনি আমাদের পিতা । কখনও অসৎ আচরন কোরনা ... ‘’  বাব্বাঃ ! এত প্রেম রাখব কোথায় ? হল তো এবার ? প্রেম ঘুরে এসে বাঁশ দিল তো ?
নাহ্ ! জয়ন্ত কোনোও দিনই যীশুখৃষ্ট হতে পারবেনা । শত চেষ্টা করলেও , না । নিষ্ঠুরতার লক্ষ লক্ষ উদারন আছে । এমন ঘটনাও আছে  যেখানে প্রেম ভালবাসা রঙ বদলে ক্রমে উত্তরিত হয়েছে প্রবল নিষ্ঠুরতায় । না কি , অবতরণ ! নিষ্ঠুরতাও জীবনের একটা আঙ্গিক । মানব চেতনার একটা দিক । এমন এক ডায়ামেনশন , পরিচিত জগতকে যা নিমেষে বদলে দিতে পারে ।
রুম্পার মা ছিল না । কাকা কাকীর কাছে বড় হয়ে ওঠা । পাঁচ ছেলে পুলের মা , রুম্পার কাকী বিকেলে রুটি তৈ্রী করে সংখ্যা গুনে রাখত । প্রতিদিন । একদিন খিদের জ্বালায় রুম্পা ছাগলদের জন্য বরাদ্দ আধকাঁচা রুটি থেকে একটা চুরি করে জামার ভাঁজে লুকিয়ে রেখে দিয়েছিল । পাকা চোর নয় , সুতরাং ধরা পড়ল । এবং কাকীর বিষাক্ত প্রশ্নের উত্তরে জবাব দিল , সবথেকে ছোট্ট যে ছাগলছানা্টা , তাকে নাকি আদর করে ওটা খাওয়াতো ! শাস্তিস্বরূপ সেই রাতটা রুম্পা ছাগলদের ঘরেই বন্ধ থাকল । পোষা ছাগল গরু কুকুর টিয়া কিছু কম ছিলনা ওদের । হয়ে গেল প্রায় চল্লিশ বছর আগের পুরনো গল্প । রুম্পাকে জয়ন্ত দেখেনি । তবু ব্যাপারটা যেহেতু নিষ্ঠুরতা , প্রসঙ্গটা তাই এসেই যায় ।
জীবন , শ্যামা , মদনপুরী , অমরীশ পুরী , এঁরা কি নিষ্ঠুরতার  প্রতিচিত্র ? যদি তাই হবে এঁদের অভিনয়  ও মানুষের বাস্তব জীবন এক । একটা সুন্দর ঘর ছিল । বিকাশ আর আরতি । বাড়ির অমতে বিয়ে করেছিল দুজনে এবং তারপর যা যা হয় । ক্রমে একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ওঠা । -- আজকাল পাঁও জমীপে নহী পড়তে মেরে ... । সংগীত আর ডি বর্মন । লিরিক গুলজার । গুলজারের পুরো নাম সম্পুর্ন সিং কালোরা । সবার জানা নেই যেটা । যাইহোক । এই ফিল্মটার ডিরেক্টর ছিলেন মানিক চ্যাটার্জী । আশরানী প্রেমা নারায়ন অসিত সেন  এবং অপ্রতিরোধ্য সুন্দরী নায়িকা রেখা ও সুদর্শন নায়ক বিনোদ মেহরা । ... আপ কী আঁখো মে কুছ , মেহেকে হুয়ে সী রাজ হ্য... , একটা টলটলে প্রেমের গল্প । কিন্তু সেখানেও সেই ভীষণ নিষ্ঠুরতা । এক রাতে গুন্ডাদের হাতে ধর্ষিত হল রেখা । ফিল্মের প্রথমাংশে নিখাদ প্রেম , বাকি অর্ধেকাংশে  ধর্ষন , ধর্ষনোত্তর রেখার মানসিক বিভ্রাট , পাড়া প্রতিবেশীদের অমানবিক ব্যবহার । প্রেম না নিষ্ঠু্রতা  দৈনন্দিন বেঁচে থাকায় কোনটার বেশি  জায়গা , কে বলবে ? কারন ঋত্বিক রোশন আজও আর্ত্তনাদ করে চলেছেন , ম্যয় তেরা কাবিল নহী , ম্যয় তেরা কাবিল নহী ......
কে নিষ্ঠুর ? কার নিষ্ঠুরতা সব চাইতে অসহ্য ? ধর্ষক ? রাজনৈ্তিক নেতা ?শ্রমিক শোষনকারী কারখানা মালিক ? দাস ব্যবসায়ী ? না কি সাড়ে তিন বছরের শিশুকে ছ’শো পাতা কারসিভ রাইটিং হোম ওয়ার্ক করতে দেওয়া স্কুল ম্যাডাম ?
এক উঠোনে পরপর পাশাপাশি গোল হয়ে বসেছিল রাঙা ঠাকুমা , জবা পিসী , মনুয়া পিসী ,নারান কাকু , হলধর জ্যাঠা , কান্তি মামা , সীমা , অর্ক , রূপা , রূপার আড়াই বছরের ছেলে পুটিয়া ... সীমার বিয়ের দিন সকাল । ছেলের বাড়ি থেকে গায়ে হলুদের তত্ব এসেছে ... বড় রুই , কাঁসার জামবাটি ভরতি ক্ষীর , ছানার সন্দেশ , আলতা সিঁদূ্র বেনারসী কাজললতা  - । বৈশাখ মাসের দিন , বিকেল থেকে কাল্বৈশাখী শুরু হল। চারিদিকে হৈ হৈ রৈ রৈ...
সীমা এখন থাকে নাইরোবি । গত আঠেরো বছরে আর এমুখো হয়নি । অর্ক অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে । হলধর জ্যাঠা আর রাঙা ঠাকমা তার পরে পরেই । জবা পিসীর খবর জানি না । অতবড় উঠোনটায় শুকনো পাতার রাশ , ঘুলঘুলিতে পায়রাদের বকমবকম ।
কাল এর চেয়ে নিষ্ঠুর আর কে আছে ?
এতদুর লিখে জয়ন্তকে দেখতে দিয়েছিলাম । অবাক চোখে শুধলো , জয়ন্তর কি হল? কালার প্রিন্ট আউট ?...... ধূর ! তোমার লেখা দিন বো দিন ফালতু মেরে যাচ্ছে !
কথাটা ঠিক । একজন সিরিয়াস লেখক কেন আর গল্প লিখবেন ? গল্প এখন উধাও হয়ে গেছে উজানতলির গাঁয়ের পথে । গুলজারের পুরো নাম কি ? এটাও এখন একটা গল্প । যে বলতে পারবে । মেগা সিরিয়াল , মিডিয়া , খবরের কাগজরা প্রতি মুহুর্তে এখন মানুষকে গল্প গিলিয়ে দিচ্ছে । গল্পকে তাই নির্ধি্ধায় হত্যা করেছি , থাকুক  সেরিবেলামের কোনও এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিজস্ব লাবণ্য ও রিগর মর্টিশ সহ ।
শুনে জয়ন্ত বলেছিল , তুমি খুব নিষ্ঠুর !


Comments

Popular posts from this blog

দেহলিজ-৭ প্রকাশিত হলো

সুধী দেহলিজ-৭ প্রকাশিত হলো https://dehlij7.blogspot.com/     বহু প্রতীক্ষার পর, ফির`সে দেহলিজ । প্রথমেই কৃতজ্ঞতা জানাই কবি ও লেখক বন্ধুদের । তারা ভরসা রেখেছেন, কঠিন সময়ে যোগাযোগ রেখেছেন, ফোনে কথা বলেছেন । এই করোনা কালে, বেঁচে থাকাই হলো একটা গল্প, লড়াই করে যাওয়াই একমাত্র কবিতা । দিল্লি এনসিআর এর কবি বন্ধুরা আমার সঙ্গে ছিলেন, তারা আমার হয়ে দেহলিজের লেখা নিয়েছেন, নিজেরা এডিট করেছেন, সংযোজনা করেছেন ।  দিল্লির এই রুক্ষতার আবহেও এত সুন্দর একটা সাহিত্য উপস্থাপনা আমাদের দিয়েছেন, আমি সেই দেহলিজ সহযোগীদের কাছে ধন্যবাদ জানাই । শুধু দিল্লি নয়, ঢাকা, কলকাতা, হাওড়া, মেদিনীপুর, শিলিগুড়ি, বহরমপুর, হাওড়া, বাঁশদ্রোনী থেকেও আমাদের সঙ্গে থেকেছেন, ধন্যবাদ জানাই সেইসব লেখক ও কবিদের ।   দেহলিজের এই সংখ্যায় কিছু নতুন কন্টেন্ট নিয়ে কাজ করা হলো । কবিতার সঙ্গে মেশানো হলো ছবি, ভাষ্কর্ষ ও ক্যামেরা ক্লিক । দৃশ্যময়তা ও টেক্সট একে অপরের জায়গা শেয়ার করা । নেওয়া হলো কবিতা নিয়ে আলোচনা । কবিরা কি ভাবছেন ? চিত্রকরেরা কি ভাবছেন এই ২০২১ এ দাঁড়িয়ে । যুক্ত করা হলো আন্তর্জাতিক কবি ও চিন্তকদের । যারা কবিতা, গদ্য ও বিশ্বসাহিত্য

আসছে দেহলিজের সংখ্যা - ৬

 প্রকাশ পাচ্ছে দেহলিজ-৬ করোনাকালের শুরুতে প্রকাশ পেয়েছিলো, দেহলিজ-৫ ; তেমন উচ্চবাচ্য হয়নি, ইচ্ছে করেই করা হয়নি, মানুষের কাছে বেঁচে থাকাই ছিলো একটা কবিতা । লকডাউন শুরু হলো, মানুষ আটকা পড়লো ঘরে । শুরু হলো ঘরে বসে লাইভ টেলিকাস্ট । দেহলিজে - নতুন গ্রুপ একটিভিটি বেড়ে উঠেছে । তার একটা খসড়া এই রকমঃ  প্রিয় কবি বন্ধুগণ   আজকের এই বিশেষ অবসরে, আমার কিছু যত্নে লালিত প্রস্তাব রাখার অভিপ্রায়ে , এই পোস্টের অবতারণা  । দেহলিজ পত্রিকার সম্পর্কে এই  বিষয়টি একটা অভিনব ও যুগান্তকারী বলেও  মনে হয় আমার । দিল্লির যানজট, লকড ডাউন,  অফিস ব্যস্ততা, বাংলা ভূখণ্ডের দূরত্বে ভৌগলিক অবস্থান , উৎসাহী কবির স্বল্পতা বাংলা চর্চার ক্ষেত্রে একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে । তদুপরি ভাষার বিবিধতা , জাঠ হরিয়ানভি ঠাট,  পাঞ্জাবী কালচার আগ্রাসন করে নিয়েছে অনেক কিছু । বর্তমান দেশব্যাবস্থা, রাজনৈতিক সমীকরণ সাহিত্য দিল্লি-বক্ষে সাহিত্য প্রয়াসের প্রতিকুল সততই । এই রকম চ্যালেঞ্জ নেওয়াটাও একটি সাহসী পদক্ষেপ , আমাদের একত্রিত প্রয়াসে  আমরা বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডা ও অনলাইন পত্রিকার মাধ্যমে তবুও তুলে ধরেছি । দেহলিজের এই অগ্রগতি আমাদের একটা আশ

প্রকাশ হলো দেহলিজ -৬

দেহলিজ-৬ প্রকাশিত হলো   ক্লিক করুন | Click Here   বহু প্রতিক্ষার পর, ফির`সে দেহলিজ । প্রথমেই কৃতজ্ঞতা জানাই কবি ও লেখক বন্ধুদের । তারা ভরসা রেখেছেন, কঠিন সময়ে যোগাযোগ রেখেছেন, ফোনে কথা বলেছেন । এই করোনা কালে, বেঁচে থাকাই হলো একটা গল্প, লড়াই করে যাওয়াই একটা কবিতা । দিল্লি এনসিআর এর কবি বন্ধুরা আমার সঙ্গে ছিলেন, তারা আমার হয়ে দেহলিজের লেখা নিয়েছেন, নিজেরা এডিট করেছেন । দিল্লির এই রুক্ষতার আবহেও এতসুন্দর একটা সাহিত্য উপস্থাপনা আমাদের দিয়েছেন, আমি সেই দেহলিজ সহযোগীদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই । শুধু দিল্লি নয়, মেদিনীপুর, শিলিগুড়ি, বহরমপুর, হাওড়া, বাঁশদ্রোনী থেকেও আমাদের সঙ্গে থেকেছেন, ধন্যবাদ জানাই সেইসব লেখক ও কবিদের ।    এই সংখ্যায় কিছু নতুন টেমপ্লেট নেওয়া হলো । ডেস্কটপ ও মোবাইল থিম আলাদা করা হয়েছে । নতুন করে সাজানো হয়েছে মেনু লিংক । অটোমেশন করা হয়েছে । সংখ্যায় বৈচিত্র নিয়ে কিছু কাজ করা হলো । কবিতা ছাড়াও রাখা হলো মুক্তগদ্য, অনূদিত নাটক, বই রিভিউ, স্মৃতিচারনা ও ছোট হল্প । আর একটি বিষয় নিয়ে এই প্রথম কাজ করা হলো সেটা হলো - কবিতা ও চিত্রকলার মিলনসংহার । ৬ জন কবির কবিতাকে উডকাট ব্লাক এন্ড হো