Skip to main content

প্রিয়দর্শী দত্ত

প্রেমের ভূত


প্রিয়দর্শী দত্ত


কল্পনাও করে উঠতে পারিনি যে গল্পটা ঠিক ওই ভাবে শুরু হয়ে যাবে- রাইসিনা স্কুলের হল-ঘরে, গল্প বলার আসরে, আমার জীবনে| পৌলমী মেয়েটি যেন দিন-দুপুরে রাগ অঘোরীর তান ধরে মধ্যরাত্রি নামিয়ে আনলো| সুরের মুর্চ্ছনাতে নয়, গা ছম ছম ভুতের গল্প শুরু করে| স্বীকার করি গল্পটি তার নিজের নয়, রাজ শেখর বসু ওরফে পরশুরামের| সে যুগে ‘উৎস’ বলে একটি সংগঠন বাংলা দিল্লির স্কুলগুলো কে নিয়ে একটা আন্ত:স্কুল প্রতিযোগিতার আয়োজন করত| গল্প বলা, তাত্ক্ষনিক বক্তৃতা ইত্যাদি| সেদিন সব ছাত্র ছাত্রীরাই বলার জন্য খ্যাতনামা লেখকদের এক একটা ছোট গল্প বেছে নিয়েছিল| কেউ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কেউ রবীন্দ্রনাথ, কেউ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কেউ তারাশংকর বা আশাপূর্ণা দেবী| যতদুর মনে পড়ে আমি সত্যজিত রায়ের একটা গল্প বলেছিলাম| সেটা ছিল একটা ‘লাস্ট লাইন শকার’ অর্থাত শেষ পঙ্ক্তি টি পড়লেই তবেই গল্পের রহস্যটা ব্যক্ত হবে|

     কিন্তু ইউনিয়ন একাডেমির একাদশ শ্রেনীর ছাত্রী পৌলমী গল্পটির শুরুতেই এক অদ্ভুত আবহ সৃষ্টি করেছিল| পরশুরামের গল্পটির নাম জটাধারী বক্সী না জটাধর বক্সী এমনি কিছু একটা ছিল| আসলে ব্যোমকেশ বক্সী সুত্রে নামটা মনে রেখেছি কারণ ব্যোমকেশ ও যিনি, জটাধর ও তিনি, অর্থাৎ মহাদেব শিব| পৌলমী এই বলে শুরু করলো যে আমরা যেখানে বসে রয়েছি, সেই গোল মার্কেটর পেছন দিকেই একটা পাড়া আছে কুচা চমৌকিরাম, সেখানে এক শীতল পৌষ মাসের সন্ধ্যেবেলা কালী বাবুর চায়ের দোকানে বাঙালিদের আড্ডা বসেছে| সত্যি বলতে কি তার পরের কয়েকটা লাইন আর আমি বেমালুম মিস করে গেছিলাম| কিন্তু এমন কি কখনো আপনার সঙ্গে হয়নি যে গায়িকার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে আপনি রবীন্দ্রসংগীতের কয়েকটা লাইন ছেড়ে গেছেন? হয়ত বা পুরো গানটাই|

     যখন সম্বিত ফিরে পেলাম তখন জটাধর বক্সী দৃশ্যে ঢুকে পড়েছেন|সবার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন যে তাঁর গল্পটি শেষ হলেই চায়ের দোকানের সবাই ততক্ষনাৎ ভূত দেখতে পাবে| যদি তিনি না দেখাতে পারেন, তবে সবার চায়ের দাম টা চুকিয়ে দেবেন| তার পর তিনি ফেঁদে বসলেন এক অদ্ভুত আষাঢে গল্প বর্মা-তাইল্যান্ড সীমান্তে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কার| কিন্তু শীতের সন্ধ্যে, তার পর গরম চায়ের পেয়ালা, সেই জাদুবাস্তবতার আবেদন অমান্য করা যায়না| গল্প কি ভাবে শেষ হয়েছিল মনে নেই| কিন্তু প্রচুর হাত-তালি পড়েছিল মনে আছে|

     সেই দিন ই এক বারের জন্য পৌলমীর সাথে দেখা হয়েছিল| রাইসিনা স্কুলের করিডরে প্রতিযোগিতা শেষে| ভয়ে বুকটা দুরুদুরু করছিল, সেটা শৈশবের ভুতের ভয় নয়, কৈশোরের ভয়|তাকে দেখে কেন জানিনা তাসের ইস্কাবনের বিবির মত লাগছিল|আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কুচা চামৌকিরাম বলে কি সত্যিই কোনো জায়গা গোল মার্কেটে আছে, মানে রাজ শেখর বসু কি দিল্লির ভূগোল জানতেন? না কি তার বন্ধু মেঘনাদ সাহার মুখে দিল্লির বর্ণনা শুনে লিখে দিয়েছিলেন কিছু একটা|  পৌলামি অদ্ভুত হাসি হেসে বলেছিল হয়তো আছে| তার পর আর কোনো কথা হয়নি| রবীন্দ্রনাথের জীবন স্মৃতির সেই জোড়াসাঁকোর বাড়ির ভেতরেই অদৃশ্য রাজবাড়ির মত তার সন্ধান আজ ও পেলাম না|

     পৌলমীর সাথে দেখা হত প্রায়ই| গরমকাল শুরু হতেই ভোর রাতে যখন ঘুম ভেঙ্গে যেত বুঝতে পারতাম সে তো এসেছিল|দশটা বাজলেই ভাবতাম এবার সে সময় করে আমাদের সে দিন কার সাক্ষাতের কথাটা ভাবছে| করল বাগ থেকে মন্দির মার্গ দিয়ে ফিরতে ফিরতে ভাবতাম পেশওয়া রোডের মোড়ের মাথায় তার সাথে দেখা হবেই| দশ মিনিট অপেক্ষাও করতাম| দেখা হয়েছিল কি? যাক সে সব কথা| কত যুগ কেটে গেছে|

     হুডমুড্ করে বছর গুলো কোথায় চলে গেল| তাসের ডমিনো এফেক্ট এর মত অনেক স্বপ্ন ভেঙ্গে পড়ল| জীবনে যা ভেবে দেখিনি এমন অনেক প্লান ও সার্থক হলো| কিন্তু মন্দির মার্গ দিয়ে ফিরতে ফিরতে মনে হয় আবার আমি সেই ক্লাস ইলেভান সাইন্সর ছাত্র| হয়ত যদি চলে যেতে পারতাম আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ড, জার্মানি নিদেন পক্ষে বাঙ্গালোর, হ্য্দেরাবাদ, পুনে তাহলে ভালো হত| সব ভুলে যেতে পারতাম| কিন্তু একেই শহরে থেকে যাওয়ার ফলে অতীত বর্তমান সবই সব সময় কাছাকাছি|

আপনারা জানেন যে মার্কেটিংর সুত্রে আমাকে দিল্লির এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে হয়| সেদিন একটা ঝটকা লাগলো| গিয়েছিলাম ইস্ট প্যাটেল নগরের একটা অফিসে| ভেবেছিলাম মাল সাপ্লাইর অর্ডার টা আমরা পাবো| কিন্তু ব্যাপার টা সে রকম ফলপ্রসু হলনা| কিন্তু কাকতালীয় ভাবে এক বাঙালি কর্মীর সাথে দেখা হয়ে গেল সেই অফিসে| কার্ডটা এখনো রয়েছে, দিব্যেন্দু সোম, পারচেসিং অফিসার| কথায় কথায় জানা গেল সে ইউনিয়ন একাডেমির প্রাক্তন ছাত্র, আমাদের বছরেই পাস করে বেরিয়েছে|ভাবলাম পৌলমীর কথাটা জিজ্ঞেস করি, সেও তো তখন ১১ এ যখন আমি ১১| তাহলে ও ওর ব্যাচমেট ছিল| জিজ্ঞেস করলাম কত দিন পড়েছেন ইউনিয়ন একাডেমির তে| সে বলল প্রায় আট বছর, ক্লাস ফাইভ থেকে টুএলভ| “যখন থেকে বাবা লখনৌ থেকে বদলি হয়ে দিল্লি এলেন’| আমি ও সবে আগ্রহী ছিলাম না| ভাবলাম পৌলমীর বিষয় জিজ্ঞেস করি, কিন্তু কি উত্তর পাব, পৌলমীর হয়ত বিয়ে হয়ে গেছে, পরিবার আছে, হয়ত অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে| সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম “আচ্ছা পৌলামি বলে কাউকে চেনেন, ইউনিয়ন একাডেমির?”
‘পৌলমী ঘটক, ব্যাডমিন্টন খেলত?’| ‘ব্যাডমিন্টন নয় টেবিল টেনিস, সে তো বেস্ট বেঙ্গল কে রিপ্রেসেন্ট করত, তার কথা কেন বলবো?’| “আপনাদের ক্লাসে পৌলমী সিনহা বলে এক জন ছিল না, কম্পিটিশন এ অংশগ্রহণ করতো”| “পৌলমী আমাদের ক্লাসে? আমাদের স্কুলে ও নামে কেউ ছিল বলে মনে নেই”| “মৌসুমী নয় তো, মৌসুমী মুখার্জী ও ড্রয়িং করত ভালো”|

‘আরে না পৌলমী বললাম তো, ড্রয়িং করত কিনা জানিনা’| দিব্যেন্দু কাকে জানিনা ফোন করলো, কোনো এক মহিলা কে, মোবাইল টা স্পিকার এ রেখে দিল| জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা অরুন্ধতি, মেয়েদের মধ্যে আমাদের স্কুলে পৌলমী বলে কেউ ছিল, মনে আছে?” ও দিক থেকে উত্তর এলো, “না তো কোনদিন দেখিনি, শুনি ও নি”|

তবে কি গোড়ায় গলদ? আমি ভুলে গেছি? আরে আমি কি করে ভুলবো? পৌলমী!

Comments

Popular posts from this blog

দেহলিজ-৭ প্রকাশিত হলো

সুধী দেহলিজ-৭ প্রকাশিত হলো https://dehlij7.blogspot.com/     বহু প্রতীক্ষার পর, ফির`সে দেহলিজ । প্রথমেই কৃতজ্ঞতা জানাই কবি ও লেখক বন্ধুদের । তারা ভরসা রেখেছেন, কঠিন সময়ে যোগাযোগ রেখেছেন, ফোনে কথা বলেছেন । এই করোনা কালে, বেঁচে থাকাই হলো একটা গল্প, লড়াই করে যাওয়াই একমাত্র কবিতা । দিল্লি এনসিআর এর কবি বন্ধুরা আমার সঙ্গে ছিলেন, তারা আমার হয়ে দেহলিজের লেখা নিয়েছেন, নিজেরা এডিট করেছেন, সংযোজনা করেছেন ।  দিল্লির এই রুক্ষতার আবহেও এত সুন্দর একটা সাহিত্য উপস্থাপনা আমাদের দিয়েছেন, আমি সেই দেহলিজ সহযোগীদের কাছে ধন্যবাদ জানাই । শুধু দিল্লি নয়, ঢাকা, কলকাতা, হাওড়া, মেদিনীপুর, শিলিগুড়ি, বহরমপুর, হাওড়া, বাঁশদ্রোনী থেকেও আমাদের সঙ্গে থেকেছেন, ধন্যবাদ জানাই সেইসব লেখক ও কবিদের ।   দেহলিজের এই সংখ্যায় কিছু নতুন কন্টেন্ট নিয়ে কাজ করা হলো । কবিতার সঙ্গে মেশানো হলো ছবি, ভাষ্কর্ষ ও ক্যামেরা ক্লিক । দৃশ্যময়তা ও টেক্সট একে অপরের জায়গা শেয়ার করা । নেওয়া হলো কবিতা নিয়ে আলোচনা । কবিরা কি ভাবছেন ? চিত্রকরেরা কি ভাবছেন এই ২০২১ এ দাঁড়িয়ে । যুক্ত করা হলো আন্তর্জাতিক কবি ও চিন্তকদের । যারা কবিতা, গদ্য ও বিশ্বসাহিত্য

আসছে দেহলিজের সংখ্যা - ৬

 প্রকাশ পাচ্ছে দেহলিজ-৬ করোনাকালের শুরুতে প্রকাশ পেয়েছিলো, দেহলিজ-৫ ; তেমন উচ্চবাচ্য হয়নি, ইচ্ছে করেই করা হয়নি, মানুষের কাছে বেঁচে থাকাই ছিলো একটা কবিতা । লকডাউন শুরু হলো, মানুষ আটকা পড়লো ঘরে । শুরু হলো ঘরে বসে লাইভ টেলিকাস্ট । দেহলিজে - নতুন গ্রুপ একটিভিটি বেড়ে উঠেছে । তার একটা খসড়া এই রকমঃ  প্রিয় কবি বন্ধুগণ   আজকের এই বিশেষ অবসরে, আমার কিছু যত্নে লালিত প্রস্তাব রাখার অভিপ্রায়ে , এই পোস্টের অবতারণা  । দেহলিজ পত্রিকার সম্পর্কে এই  বিষয়টি একটা অভিনব ও যুগান্তকারী বলেও  মনে হয় আমার । দিল্লির যানজট, লকড ডাউন,  অফিস ব্যস্ততা, বাংলা ভূখণ্ডের দূরত্বে ভৌগলিক অবস্থান , উৎসাহী কবির স্বল্পতা বাংলা চর্চার ক্ষেত্রে একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে । তদুপরি ভাষার বিবিধতা , জাঠ হরিয়ানভি ঠাট,  পাঞ্জাবী কালচার আগ্রাসন করে নিয়েছে অনেক কিছু । বর্তমান দেশব্যাবস্থা, রাজনৈতিক সমীকরণ সাহিত্য দিল্লি-বক্ষে সাহিত্য প্রয়াসের প্রতিকুল সততই । এই রকম চ্যালেঞ্জ নেওয়াটাও একটি সাহসী পদক্ষেপ , আমাদের একত্রিত প্রয়াসে  আমরা বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডা ও অনলাইন পত্রিকার মাধ্যমে তবুও তুলে ধরেছি । দেহলিজের এই অগ্রগতি আমাদের একটা আশ

প্রকাশ হলো দেহলিজ -৬

দেহলিজ-৬ প্রকাশিত হলো   ক্লিক করুন | Click Here   বহু প্রতিক্ষার পর, ফির`সে দেহলিজ । প্রথমেই কৃতজ্ঞতা জানাই কবি ও লেখক বন্ধুদের । তারা ভরসা রেখেছেন, কঠিন সময়ে যোগাযোগ রেখেছেন, ফোনে কথা বলেছেন । এই করোনা কালে, বেঁচে থাকাই হলো একটা গল্প, লড়াই করে যাওয়াই একটা কবিতা । দিল্লি এনসিআর এর কবি বন্ধুরা আমার সঙ্গে ছিলেন, তারা আমার হয়ে দেহলিজের লেখা নিয়েছেন, নিজেরা এডিট করেছেন । দিল্লির এই রুক্ষতার আবহেও এতসুন্দর একটা সাহিত্য উপস্থাপনা আমাদের দিয়েছেন, আমি সেই দেহলিজ সহযোগীদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই । শুধু দিল্লি নয়, মেদিনীপুর, শিলিগুড়ি, বহরমপুর, হাওড়া, বাঁশদ্রোনী থেকেও আমাদের সঙ্গে থেকেছেন, ধন্যবাদ জানাই সেইসব লেখক ও কবিদের ।    এই সংখ্যায় কিছু নতুন টেমপ্লেট নেওয়া হলো । ডেস্কটপ ও মোবাইল থিম আলাদা করা হয়েছে । নতুন করে সাজানো হয়েছে মেনু লিংক । অটোমেশন করা হয়েছে । সংখ্যায় বৈচিত্র নিয়ে কিছু কাজ করা হলো । কবিতা ছাড়াও রাখা হলো মুক্তগদ্য, অনূদিত নাটক, বই রিভিউ, স্মৃতিচারনা ও ছোট হল্প । আর একটি বিষয় নিয়ে এই প্রথম কাজ করা হলো সেটা হলো - কবিতা ও চিত্রকলার মিলনসংহার । ৬ জন কবির কবিতাকে উডকাট ব্লাক এন্ড হো