Skip to main content

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

এনকাউন্টার

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়


এই শহরের গঙ্গার পাড়ে রাস্তাটা নদী বরাবর ঢালু হয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। পথটা জলের সাথে গলা জড়াজড়ি করে মিশে। ডানদিকে ফেরিঘাট। কাঠের জেটিতে মানুষ চলাচল করে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। জেটিটা বেশ পুরনো। তাই মানুষের ভারে মাঝে মাঝে ক্যাঁচ কোঁচ করে আর্তনাদ করে। বাঁ দিকে উঁচু পাড়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে ল্যাটা নিতাই। চেহারাটার জন্য ওর আর একটা নাম আছে, ছিবড়ে। কুচকুচে কালো পাকানো শক্ত শরীরে শিরাগুলো উঁচু হয়ে জেগে থেকে তাদের অস্তিত্ব প্রকট করে তুলেছে। নিতাইয়ের মাথায় একরাশ লম্বা চুল, রোজ খুব যত্ন  নিয়ে সাবান ঘষে। কিন্তু ওর মুখমণ্ডল এত কদর্য যে বেশিক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকা মুশকিল। গালের হনু দুটো বাইরের দিকে ঠেলে এসেছে, সারা মুখ আঁচিলে ভর্তি। 
সকাল বেলায় গঙ্গার পাড়ে হাওয়া বড় মিষ্টি। উঁচু পাড়ের একদম ধার ঘেঁসে দাঁড়িয়ে দাঁতন ঘষতে ঘষতে নিচে মেয়ে বউদের স্নানের দৃশ্য উপভোগ করছে নিতাই। সবে চৈত্র পার হয়ে বৈশাখ মাস। এ সময় গঙ্গা স্নানের হিড়িক পড়ে যায়। কাপড়ের টানা আড়াল দিয়ে সবাই ঝটতি পরনের কাপড় বদল করছে। উপরে দাঁড়িয়ে নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখতে নিতাইয়ের কোন বাধা নেই। 
নিতাইয়ের ঠিক পিছনে আছে এ শহরের জল সরবরাহের জন্য পাম্পিং স্টেশন। সেখানে পাম্প অপারেটরের গলা পায় নিতাই। শব্দ করে পাম্প চালু হয়। নিতাই ঘুরে হাঁটতে থাকে পাম্প ঘরের দিকে। পাম্প চালক বিষ্টু একটা হিন্দি গান চেঁচিয়ে গাইছিল আর মেশিনের বড় বড় গোল স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে জল ছাড়ছিল। নিতাইকে দেখে বিষ্টুর গান থেমে যায়। নিতাই দাঁতন মুখে নিয়ে বিষ্টুর পিছনে একটা লাথি মেরে বলে, “কি বে শালা, একটা আধা বোতল রেখেছিলাম ঘরে, সেটা কাল মেরে দিলি একাই! রাতে ফিরে দেখি নেই।”
বিষ্টু আমতা আমতা করে, “ভাবলাম তুমি ফিরবে না...”
“চোপ শালা, জানে মেরে দেব। তোমার ভাবার আমি একশ আটবার...”
নিতাইয়ের হাত থেকে বাঁচতে বিষ্টু ছুট দেয় বাইরে, যেতে যেতে দাঁত বার করে হাসতে হাসতে বলে, “কালুদার দোকানে এস, চা খাবে না?”
নিতাই বিষ্টুর দিকে তেড়ে জাওয়ার ভঙ্গি করে। দাঁতন ছুঁড়ে দিয়ে মুখ ধোয় কলঘরে। 
এই কলঘরই ল্যাটা নিতাইয়ের বাসস্থান। চালচুলো, ঠিকানা বিহীন, ফুটপাতে মানুষ নিতাই। এখন আর মনেও পড়ে না, বাবা বা মা কোনদিন ছিল কি না। কত বছর এই কলঘরে, তাও আর মনে নেই। খুব বেশি ভাবেও না নিতাই এ নিয়ে। ভাবনা একটাই, পেটের খিদে আর নেশার বস্তু জোগাড় করা। সে যে ভাবেই হোক। আগে এ তল্লাটের আলুর গুদামে আলুর বস্তা লরিতে তোলার কাজ করত। তখন ওর বয়স ষোল কি সতের হবে বোধহয়। সন্ধেবেলায় নেশার আড্ডা থেকে এই এলাকার ছিনতাই বাজদের সাথে বন্ধুত্ব হয়। সহজ রোজগার শুরু করে। কাজ ছিল সন্ধেবেলায় গঙ্গার পাড়ের আধো অন্ধকারে দেশি পিস্তল বা চাকু ঠেকিয়ে মানুষকে লুটে নেওয়া। আজকাল সে কাজেও ভাঁটা পড়েছে। এই এলাকার জুটমিলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কল কারখানায় কাজ করা লোকগুলো নিজেরাই পেটের ধান্দায় ঘুরছে। কেউ কেউ নিতাইদের পেশাতেও ঢুকে পড়ছে। 
তাই নিতাই এখন মানুষ খুন করে পেট চালায়। খুনের বাজারের এখন রমরমা। রাজনৈতিক খুনই বেশি। একটা খুন করতে পারলে অনেক টাকা পাওয়া যায়। মাসে একটা কি দুটো কাজ করতে পারলেই পুরো মাসটা ভাল ভাবে চলে যায় নিতাইয়ের। চাকু দিয়ে মানুষ মারতে বিশেষ শব্দ টব্দ হয় না। খতম করার পর লাশ সরানোর জন্য লোক আছে। যাকে মারল, তার মরে জাওয়াটা নিশ্চিত করতে পারলেই নিতাইয়ের কাজ শেষ। তখন ও আগে ভাগে কিনে রাখা মদের বোতলটা পুরো সাবাড় করে গঙ্গার পাড়ে এসে বসে। খুন করাটা এতটাই পেশাদারিত্বের সাথে করে থাকে নিতাই যে, কাজ শেষ হবার পর মনেই আনে না কিছু, অনুশোচনা তো দূরের কথা। 
******
কালুদার চায়ের দোকানে পশারিদের ভিড় থাকে সাত সকালে। লঞ্চ পার হয়ে গঙ্গার ওপারে গিয়ে বিক্রিবাটা সেরে তারা ফেরে সেই বেলা শেষ করে। লঞ্চের ডেকের উপর আলু কপির বস্তা উঠানোর কাজে কুলি কামারিদের শোরগোল ভেসে আসছে। নিতাইকে দোকানের দিকে আসতে দেখে চায়ের দোকানের খদ্দেররা শশব্যস্ত হয়ে সরে বসে। বেঞ্চে বসার জায়গা করে দেয়। নিতাই সে সবে ভ্রুক্ষেপ না করে সোজা দোকানের ভিতর ঢুকে টুল টেনে বসে পড়ে। তারপর কালুর দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় চায়ের জন্য। কালু নিতাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসে। নিতাইয়ের মুখের একটা রেখাও কাঁপে না। হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিয়ে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে থাকে। খদ্দেররা সবাই নিতাইকে চেনে, তাই তারাও একবারের জন্য তার দিকে তাকিয়ে চুপ মেরে যায়। এতক্ষণ তারা পরস্পরের সাথে রঙ্গ রসিকতায় মেতে ছিল। নিতাই আসাতে সে রস ভঙ্গ হয়। চায়ের কাপ শেষ হতে যে যার কাজে পা চালায়। দোকান ফাঁকা হতে কালু জিজ্ঞাসা করে, “কাল কি অপারেশন করে এলি নাকি?”
নিতাইয়ের গলায় ‘ঘোঁত’ করে একটা আওয়াজ উঠল। কালু বড় সসপ্যান থেকে জগে চা  ঢালতে ঢালতে বলল, “আর কদিন নিতাই? এবার একটা কাজ কম্ম জুটিয়ে নে কোথাও!”
কালুর কথায় নিতাইয়ের শরীরের শিরা দপদপিয়ে জেগে ওঠে। নিতাই একটা অশ্রাব্য গালাগাল দিয়ে বলে, “‘শালা, তোমার কোন মাগের ছেলে দেবে আমাকে চাকরি?”
নিতাইয়ের মর্জি আর মেজাজের সাথে ভালই পরিচয় আছে কালুর। তাই জগের থেকে সামনের চায়ের গ্লাস গুলোতে চা ঢালতে ঢালতে বলল, “এখন থানায় নতুন অফিসার এসেছে জানিস কি? কোন শালা বাঁচাবে তোকে? চালান করে দেবে সদরে।”
নিতাই যে আগে কোনদিন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে নি তা নয়। ছিনতাই করে দুএকবার জেল খেটেও এসেছে। জেলের ভিতর থেকেই অর্ডারি খুন করার লোভনীয় দিকটা ওর চোখের সামনে খুলে যায়। ছিনতাই করার কাজেই চাকু চালানো রপ্ত করে ফেলে। প্রথম দু একবারের পর খুন করাটা জলভাত হয়ে যায়। আজ পর্যন্ত কতজনের প্রাণ ওর হাতে গেছে, তার হিসেব নিতাইয়ের নিজেরও জানা নেই। এ বিষয়ে মাথা ঘামাবার মত প্রয়োজন আছে বলেও মনে হয় নি কখনো। ওর সোজা কথা, টাকা ফেল কাজ নাও। নিতাইয়ের কাছে শুধু খবর আসে কখন খুনটা করতে হবে। জায়গা ঠিক করে নিতাই নিজে। যাকে খুন করা হয় তাকে কোড নামে বলা হয় ‘মুরগী’। সে মুরগীকে কারা বেঁধে আনবে, লাশ কারা সরাবে সব কিছুর জন্য আলাদা আলাদা লোকের আলাদা আলাদা দায়িত্ব। খুনের সময় কাছে কেউ থাকে না। সে সময় নিজের মুখ গামছা দিয়ে ঢেকে নেয় নিতাই। তারপর খুব দ্রুত হাতের ন ইঞ্চি চাকুতে কব্জির চাপ গলায় বসানো। পুলিশ টুলিশের ঝামেলা সামলানোর অন্য লোক আছে। সে সব নিয়ে কোন চিন্তাই আসে না নিতাইয়ের নিরেট মাথায়।
তাই চায়ের কাপটা সামনের টেবিলে শব্দ করে ছুঁড়ে দিয়ে উঠে পড়ে নিতাই। তারপর কোমরে গামছা বেঁধে গঙ্গার জলে ঝাপ দেয়। আঃ, সারা শরীর জুড়িয়ে যায় ঠাণ্ডা জলে ডুব দিয়ে। ভোপু বাজিয়ে লঞ্চ ছাড়ে ফেরিঘাট থেকে। কালু বিড়বিড় করে বলে ওঠে, “ছিবড়ে শোধরাবার নয়, মরবে শালা, ঠিক মরবে।”
গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে আকাশ রাঙিয়ে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। ওপার থেকে মিল কারখানায় কাজ করা মানুষগুলো লঞ্চ থেকে নেমে দ্রুত পা চালাচ্ছে বাড়ির দিকে। কলেজ ফেরত ছেলেমেয়েদের দলও লাফাতে লাফাতে ফিরছে। গঙ্গার মাঝ বরাবর একখানা পাল বিহীন নৌকা টানছে এক মাঝি। পাম্প ঘরের লাগোয়া জোড়াবটের নিচে পা ছড়িয়ে বসে নিতাই। খালি গা। পরনে একটা নীল রঙের ফুলপ্যান্ট। কাঁধের গামছা দিয়ে মাছি তাড়াচ্ছে আর মাঝে মাঝে ঘাম মুছছে। গঙ্গার দিকেই তার দৃষ্টি নিবদ্ধ। চলে যাওয়া নৌকাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হল, নিজের জীবনটাও  যেন সে একা দাঁড় টেনে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেন যেতে হবে বলেই যাওয়া, চলতে হবে বলেই চলা। কোথায় যেতে হবে তা জানা নেই বলেই বোধহয়। 
হটাত এহেন একটা দার্শনিক জ্ঞান কি করে তার মত আকাট মুক্ষুর মনে এল সে কথা ভেবে বেজায় হাসি পেল নিতাইয়ের। সে উঠে গেল পাম্প ঘরের ভিতর। দুপুরে অনুপম হোটেলে পেট ভরে ভাত মাংস খেয়ে এসেছে। তারপর দিয়েছে একটা লম্বা দিবানিদ্রা। গতকালের রোজগারে কটা দিন এখন ভালই চলবে। আসবার সময় আজ একটা বিলেতি মদের বোতল তুলে নিয়ে এসেছে স্টেশন রোডের লাইসেন্সড দোকান থেকে।  পাম্প ঘর থেকে বেরিয়ে এসেই নিতাইয়ের নজরে পড়ল পাশের সরু কাঁচা রাস্তাটাতে, যেটা নেমে গিয়েছে গঙ্গায়। এ রাস্তায় লোক চলাচল বিশেষ হয় না।  কাঁচা রাস্তার পাশের অন্ধকার চাতালে তিনটি খুব কম বয়সী ছেলে গাঁজার কলকেতে টান দিচ্ছে। বোতল নিয়ে বসা আর হয় না। নিতাই সোজা নেবে আসে কাঁচা রাস্তায়। ছেলেগুলোর সামনে নিতাই দাঁড়াতেই ওরা ভয় পায়। তার মুখমণ্ডল আর হাতের জেগে ওঠা শিরার দিকে তাকিয়ে থমকে যায় ওরা। নিতাই চাপা গলায় বলে। “তোরা ইস্কুলের ছেলে?”
ছেলে তিনটের একজন বলে, “না দাদা কলেজে।”
“এখন থেকেই গাঁজা টানছিস? তোরা তো ভাল ঘরের ছেলে বলেই মনে হয়।”
হাতের কলকেটা পিছনে নিয়ে ঢোঁক গিলে দ্বিতীয় জন বলে ওঠে, “আমরা রোজ খাই না। মাঝে মধ্যে একটু...”
“না খাবি না। পড়াশুনো করছিস তাই কর। কাল থেকে এখানে যেন না দেখি।”
নিতাইয়ের কসাইয়ের মত চোখের দিকে তাকিয়ে ছেলে তিনটে উঠে পড়ল। নিতাই কোমরে হাত রেখে যতটা সম্ভব নরম গলায় উপদেশ দিল, “এখানে আসিস না আর। মাঝে মাঝে পুলিশ রেড করে। ধরা পড়ে গেলে আমার মত দাগী হয়ে যাবি।”
ছেলেরা অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেই নিতাই জোড়া বটতলায় ফিরে এসে বোতল খুলে বসল। কিছুটা নিট ঢেলে দিতেই তরল নামল গলা দিয়ে জ্বলতে জ্বলতে। বোতল শেষ করতেই শরীর গরম হয়ে গেল। নাঃ, আজ পাত্র পাড়াতে না গেলেই নয়। অন্য এক জৈবিক ক্ষুধায় শরীর টানে। গঙ্গার ধার দিয়ে পাকা রাস্তা চলে গেছে মেথর পট্টিতে।  নিতাইয়ের পা টলছে না, কিন্তু মাথায় জ্বলছে আগুন। মেথর পট্টিতে শুয়োর মারার বীভৎস চিৎকার শোনা যাচ্ছে। এ বস্তিতে প্রায় সবাই বিহার থেকে আসা মানুষ। শহরের ময়লা সাফ রেখে ওরা নিজেদের গ্রাসাচ্ছাদন করে। শুয়োরের মাংস নিতাইও খেয়েছে। ভাল লাগে নি। গলায় ছুরি বসিয়ে শুয়োর মারা যায় না।ওদের গলার চামড়া  বেজায় মোটা। শুয়োরের পিছনে আগুনে গরম লাল লোহার শিক ঢুকিয়ে শুয়োর মারতে হয়। শুয়োরের চিৎকার সহ্য করতে পারে না নিতাই।  তাই দু হাতে কান চেপে রাস্তাটা দ্রুত পার হয়ে যায়। 
বাঁ হাতে এগোলেই বাজার। বাজার ছাড়াতেই আর এক বাজার, মেয়ে বাজার, পাত্র পাড়া বলে পরিচিত। বাঙালি অবাঙালি সব রকম মেয়েদের হাট। রং মেখে তারা পশরা সাজিয়ে রাস্তায়। নিতাইয়ের কোন বাঁধা মেয়েমানুষ নেই। হাতের সামনে যাকে পেল তাকে দিয়ে শরীরের চাহিদা মেটাতে পারলেই হল। ওর মুখ যে একবার দেখেছে, সে দুঃস্বপ্নে ছাড়া দুবার দেখতে চায় না। নিতাইকে দেখে অনেকেই মুখ ঘোরায়, বা ভয় পেয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ে। পৃথুলা মাঝবয়সী মেয়েটি নড়ে না। ওর হাত ধরে টেনে গলিতে ঢুকে পড়ে নিতাই।


রাত কত জানা ছিল না কালুর। গঙ্গার পাড় এখন নীরব। কালু তার চায়ের দোকানেই শুয়ে থাকে রাতে। সকাল সকাল দোকান খুলতে হয় যে! না হলে শখ করে কেউ কি আর এখানে পড়ে থাকে? বাড়ি তার সুদূর উড়িষ্যায়। প্রায় বছর তিরিশ এ শহরে চা বেচে পেট চালায়। এখন আর তাকে দেখে কেউ বলবে না কোন এক কালে সে উড়িষ্যার গ্রাম থেকে এসেছিল পেটের ধান্দায়। দোকানের বাইরে চার পাঁচ জনের পায়ের আওয়াজে কাঠের দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে বুঝলো, পুলিশের দল। সে পাল্লা খুলল না। পুলিশে তার বেজায় ভয়। চাঁদনী আলোয় গঙ্গার পাড় আলোকিত। পাল্লার ফাঁক দিয়ে বাইরে দেখা গেল দু তিনজন পুলিশ কাউকে বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছে গঙ্গার ধারে। সবার পিছনে ভারিক্কি চেহারার পুলিশ, তার কোমরে পিস্তল গোঁজা। অফিসার নিশ্চয়ই। যে লোকটা বাঁধা তার মুখ কাপড়ে জড়ানো। গোঙানির আওয়াজ আসছে। একটা পুলিশ বেমক্কা লাথি কষালো পিছমোড়া করে বাঁধা লোকটার পিছনে। লোকটা আবার গুঙিয়ে উঠল। অফিসারটি বলল, ‘মারছিস কেন? ছাড়। একেবারে উপরে পাঠিয়ে দিই শালাকে। পাড়ে নিয়ে যা’
কালুর সারা শরীর ঘেমে উঠল। দোকানের ভিতরের পাখার বাতাসও কম মনে হল নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য। চারটি পুলিশ মুখ ঢাকা লোকটিকে নিয়ে নেমে গেল গঙ্গার ধারে। তারপর এক ধাক্কা লাগল লোকটার শরীরে। চাপা তিনটে গুলি চলার আওয়াজ হল। মেথর পট্টিতে কুকুর গুলো ঘেউ ঘেউ করতে লাগল। লোকটা মরে গেছে সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে পুলিশেরা চলে গেল। অফিসারের ঘড়ঘড়ে গলায় শোনা গেল, “ড্রাগের প্যাকেট গাড়ি থেকে নিয়ে এসে পকেটে গুঁজে দাও আর সকালে রিপোর্ট কর, এনকাউন্টারে মরেছে। শালারা বড্ড বেড়েছে। রক্তবীজের ঝাড়কে গোঁড়া থেকে শেষ করে দেব।”
সকাল সকাল গঙ্গার পাড়ে লোকে লোকারণ্য। কাজে যাওয়া ব্যস্ত মানুষগুলো থমকে দাঁড়াল পুলিশ বাহিনীর তৎপরতায়। বিখ্যাত সংবাদপত্রের স্থানীয় সাংবাদিক ফটোগ্রাফার সঙ্গে নিয়ে পুলিশি বিবৃতি নিলো। গতকাল রাতে ড্রাগ পাচারকারীর একটা দল পুলিশের তাড়া খেয়ে পালাতে যায়। তাদেরই একজন পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায়। লাশ গাড়ি এসে তুলে নিয়ে গেল নিতাইয়ের রক্ত মাখা শরীর। গঙ্গার পাড় থেকে ভোঁ বাজিয়ে রওনা হল লঞ্চ। 

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

প্রকাশ হলো দেহলিজ -৬

দেহলিজ-৬ প্রকাশিত হলো   ক্লিক করুন | Click Here   বহু প্রতিক্ষার পর, ফির`সে দেহলিজ । প্রথমেই কৃতজ্ঞতা জানাই কবি ও লেখক বন্ধুদের । তারা ভরসা রেখেছেন, কঠিন সময়ে যোগাযোগ রেখেছেন, ফোনে কথা বলেছেন । এই করোনা কালে, বেঁচে থাকাই হলো একটা গল্প, লড়াই করে যাওয়াই একটা কবিতা । দিল্লি এনসিআর এর কবি বন্ধুরা আমার সঙ্গে ছিলেন, তারা আমার হয়ে দেহলিজের লেখা নিয়েছেন, নিজেরা এডিট করেছেন । দিল্লির এই রুক্ষতার আবহেও এতসুন্দর একটা সাহিত্য উপস্থাপনা আমাদের দিয়েছেন, আমি সেই দেহলিজ সহযোগীদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই । শুধু দিল্লি নয়, মেদিনীপুর, শিলিগুড়ি, বহরমপুর, হাওড়া, বাঁশদ্রোনী থেকেও আমাদের সঙ্গে থেকেছেন, ধন্যবাদ জানাই সেইসব লেখক ও কবিদের ।    এই সংখ্যায় কিছু নতুন টেমপ্লেট নেওয়া হলো । ডেস্কটপ ও মোবাইল থিম আলাদা করা হয়েছে । নতুন করে সাজানো হয়েছে মেনু লিংক । অটোমেশন করা হয়েছে । সংখ্যায় বৈচিত্র নিয়ে কিছু কাজ করা হলো । কবিতা ছাড়াও রাখা হলো মুক্তগদ্য, অনূদিত নাটক, বই রিভিউ, স্মৃতিচারনা ও ছোট হল্প । আর একটি বিষয় নিয়ে এই প্রথম কাজ করা হলো সেটা হলো - কবিতা ও চিত্রকলার মিলনসংহার । ৬ জন কবির কবিতাকে উডকাট ব্লাক এন্ড হো

চৈতালি দাস

নীপবিথি চৈতালি দাস প্রতিদিনের মত আজও ঠিক সন্ধে সাতটায় শুভ্রর ফোনটা এলো । গত দু - মাস হল এই ফোনটার অপেক্ষায় থাকে গার্গী ‌।সাতটা বাজার আগে থেকেই মোবাইলটা নাড়া চাড়া করে । কখন ও কখন ও আবার  মনে হয় মোবাইল এর রিংটোন টা মিউট করা আছে হয়তো  ,শুভ্রর ফোন বেজে গেছে শুনতে পায়নি । তারপর হাতের মুঠোয় ধরা মোবাইলটা ভালো করে দেখে বোঝে যে এসবই তার মনের ভুল । মোবাইল এর সাউণ্ড একেবারে ম‍্যক্সিমামে  দেওয়া  আছে। --হ‍্যাঁ , হ‍্যালো শুভ্র বলো বলো । -- কাল তো  তোমাদের ওদিকে ভয়ানক ঝড় - বৃষ্টি  হয়েছে দেখলাম । তোমরা ঠিক আছো তো? সকালে নিউজে খবরটা দেখতে দেখতে ভাবলাম অফিসে পৌঁছেই  তোমাকে একটা ফোন করবো কিন্তু অফিসে ঢোকার পর থেকে একটার পর একটা এমন কাজে ফেঁসে গেছি যে ফোন করতে পারিনি, এই জাস্ট পাঁচ মিনিট আগে মিটিং শেষ করে নীচে নেমে সিগারেটটা ধরিয়ে তোমাকে ফোন টা লাগালাম। -হ‍্যাঁ শুভ্র কাল ঝড়ের এই তাণ্ডবে সারা কলকাতা তছনছ হয়ে গেছে , টিভি তে বলছিল ঝড়টা নাকি প্রায় একশো কিলোমিটার বেগে চলেছিল। আমার তো ভয় করছিলো যে সত্তর বছরের পুরোনো এই বাড়ি না ভেঙে পড়ে ‌। পুরো বাড়িটা কাঁপছিল ঝড়ের দাপটে । আমাদের বাগানে  একটা  আমগাছ ও পড়েছে ,তবে

আসছে দেহলিজের সংখ্যা - ৬

 প্রকাশ পাচ্ছে দেহলিজ-৬ করোনাকালের শুরুতে প্রকাশ পেয়েছিলো, দেহলিজ-৫ ; তেমন উচ্চবাচ্য হয়নি, ইচ্ছে করেই করা হয়নি, মানুষের কাছে বেঁচে থাকাই ছিলো একটা কবিতা । লকডাউন শুরু হলো, মানুষ আটকা পড়লো ঘরে । শুরু হলো ঘরে বসে লাইভ টেলিকাস্ট । দেহলিজে - নতুন গ্রুপ একটিভিটি বেড়ে উঠেছে । তার একটা খসড়া এই রকমঃ  প্রিয় কবি বন্ধুগণ   আজকের এই বিশেষ অবসরে, আমার কিছু যত্নে লালিত প্রস্তাব রাখার অভিপ্রায়ে , এই পোস্টের অবতারণা  । দেহলিজ পত্রিকার সম্পর্কে এই  বিষয়টি একটা অভিনব ও যুগান্তকারী বলেও  মনে হয় আমার । দিল্লির যানজট, লকড ডাউন,  অফিস ব্যস্ততা, বাংলা ভূখণ্ডের দূরত্বে ভৌগলিক অবস্থান , উৎসাহী কবির স্বল্পতা বাংলা চর্চার ক্ষেত্রে একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে । তদুপরি ভাষার বিবিধতা , জাঠ হরিয়ানভি ঠাট,  পাঞ্জাবী কালচার আগ্রাসন করে নিয়েছে অনেক কিছু । বর্তমান দেশব্যাবস্থা, রাজনৈতিক সমীকরণ সাহিত্য দিল্লি-বক্ষে সাহিত্য প্রয়াসের প্রতিকুল সততই । এই রকম চ্যালেঞ্জ নেওয়াটাও একটি সাহসী পদক্ষেপ , আমাদের একত্রিত প্রয়াসে  আমরা বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডা ও অনলাইন পত্রিকার মাধ্যমে তবুও তুলে ধরেছি । দেহলিজের এই অগ্রগতি আমাদের একটা আশ